শিশুদের বমি ও পাতলা পায়খানা: করণীয় ও সতর্কতা
শিশুদের বমি ও পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া প্রায়শই ভাইরাসজনিত (যেমন রোটাভাইরাস) কারণে হয়ে থাকে। প্রধান এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক ঝুঁকি হলো পানিশূন্যতা (Dehydration)। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে দ্রুত আরোগ্য লাভ সম্ভব।
১. প্রধান চিকিৎসা: পুনঃজলয়োজন (Rehydration)
পানিশূন্যতা রোধ করাই প্রথম এবং প্রধান কাজ।
জীবনদায়ী খাবার স্যালাইন (ORS)
ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ORS) বা খাবার স্যালাইন হলো সবচেয়ে কার্যকরী ঔষধ।
পরিমাণ: শিশুর বয়স অনুযায়ী স্যালাইন তৈরি করে খাওয়ান। প্রতিবার পাতলা পায়খানা বা বমির পর অল্প অল্প করে স্যালাইন দিতে হবে।
খাওয়ানোর নিয়ম: একসঙ্গে বেশি স্যালাইন না দিয়ে চামচে করে অথবা ছোট সিপার/বোতলে অল্প অল্প করে (৫-১০ মিনিট পর পর) দিন। বমি হলে সঙ্গে সঙ্গে না দিয়ে, ১০ মিনিটের বিরতি দিয়ে আবার শুরু করুন।
শিশুদের জন্য: যদি শিশু মায়ের দুধ পান করে, তবে স্যালাইন দেওয়ার পাশাপাশি ঘন ঘন বুকের দুধ পান করানো চালিয়ে যান। এটি নিরাপদ এবং শিশুকে শক্তি দেবে। ফর্মুলা দুধ পান করলে, ফর্মুলার সাথে কিছুটা স্যালাইন মিশিয়ে বা ফর্মুলার বিরতিতে স্যালাইন দিন।
অন্যান্য তরল খাবার
স্যালাইন ছাড়াও নিম্নোক্ত পানীয়গুলো সহায়ক:
ডাবের জল।
পাতলা ভাতের মাড় বা লবণের শরবত।
ফলের রস (তবে অতিরিক্ত মিষ্টি রস এড়িয়ে চলুন)।
২. খাদ্যাভ্যাস ব্যবস্থাপনা
শিশুকে সঠিক খাবার দিলে দ্রুত শক্তি ফিরে পেতে এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে।
যে খাবারগুলো দেবেন
রোগের সময় এবং পরবর্তী কয়েক দিন সহজপাচ্য খাবার দিন (BRAT ডায়েট নয়, বরং সাধারণ পুষ্টিকর খাবার):
ভাত/খিচুড়ি: নরম ভাত বা সবজিবিহীন পাতলা খিচুড়ি।
কলা: পাকা কলা পটাসিয়াম সরবরাহ করে, যা ডায়রিয়ায় হারানো ইলেক্ট্রোলাইট পূরণে সাহায্য করে।
ডাল: পাতলা ডাল বা ডালের জল।
দই (Probiotics): যদি শিশু দইয়ে অভ্যস্ত হয়, তবে সামান্য মিষ্টি ছাড়া দই বা বাটারমিল্ক উপকারী হতে পারে, কারণ এতে থাকা প্রোবায়োটিকস অন্ত্রের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করে।
আলু: সেদ্ধ আলু বা আলুর ভর্তা (তেল-মসলা ছাড়া)।
যে খাবারগুলো এড়িয়ে চলবেন
তেল ও মসলা: অতিরিক্ত তেল, মসলাযুক্ত বা ভাজা খাবার।
মিষ্টি পানীয়: বোতলজাত জুস, সোডা বা অতিরিক্ত মিষ্টিযুক্ত পানীয়। এগুলো ডায়রিয়া বাড়াতে পারে।
শক্ত ফাইবারযুক্ত খাবার: যেমন কাঁচা সবজি বা অতিরিক্ত আঁশযুক্ত ফল।
৩. জরুরি সতর্কতা: কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
যদি নিম্নলিখিত লক্ষণগুলির মধ্যে যেকোনো একটি দেখা যায়, তবে দেরি না করে দ্রুত শিশুকে ডাক্তারের কাছে বা হাসপাতালে নিয়ে যান:
| লক্ষণ | গুরুত্ব |
তীব্র পানিশূন্যতা | চোখ কোটরাগত হওয়া, জিভ শুকিয়ে যাওয়া, শিশুর কান্নায় জল না আসা, ত্বক টেনে ধরলে দ্রুত আগের অবস্থায় না ফেরা (ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা হ্রাস)। |
প্রস্রাব কমে যাওয়া | গত ৬-৮ ঘণ্টায় একবারও প্রস্রাব না করা বা প্রস্রাবের পরিমাণ খুব কম হওয়া। |
রক্তযুক্ত পায়খানা | মলের সাথে রক্ত যাওয়া। |
উচ্চ তাপমাত্রা | ১০২° ফারেনহাইটের বেশি জ্বর। |
ক্রমাগত বমি | শিশু কিছুই খেতে না পারা এবং প্রতিবার খাওয়ার পরেই বমি করা। |
তীব্র দুর্বলতা | শিশু অতিরিক্ত নিস্তেজ, ঝিমিয়ে পড়া, বা অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত থাকা। |
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ: কখনো নিজের ইচ্ছামতো অ্যান্টিবায়োটিক বা বমি/ডায়রিয়ার ঔষধ দেবেন না। সঠিক কারণ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য সর্বদা ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

0 Comments