ডেঙ্গু হলে করণীয়: একটি নির্দেশিকা

 

ডেঙ্গু হলে করণীয়: একটি নির্দেশিকা

ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ যা প্রতি বছরই বহু মানুষকে আক্রান্ত করে। প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এবং সতর্ক থাকলে এই রোগ মোকাবিলা করা সহজ হয়। ডেঙ্গু পজিটিভ হওয়ার পর রোগীর যত্ন ও ব্যবস্থাপনার জন্য নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা দেওয়া হলো।

১. নিশ্চিতকরণ ও চিকিৎসকের পরামর্শ

জ্বর শুরু হওয়ার পর ১ থেকে ২ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু NS1 অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করিয়ে নিন। রিপোর্ট পজিটিভ এলে বা ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

২. বিশ্রাম এবং তরল গ্রহণ (প্রধান চিকিৎসা)

ডেঙ্গুর প্রধান চিকিৎসা হলো পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং শরীরে জলের ঘাটতি হতে না দেওয়া।

  • পরিপূর্ণ বিশ্রাম: জ্বর থাকা অবস্থায় এবং জ্বর সেরে যাওয়ার পরের দুই থেকে তিন দিন সম্পূর্ণ বিশ্রাম নিন। এই সময় দৌড়াদৌড়ি বা ভারী কাজ করা থেকে বিরত থাকুন।

  • পর্যাপ্ত জলীয় খাবার: ডেঙ্গু হলে শরীর দ্রুত ডিহাইড্রেইটেড (জলশূন্য) হয়ে যায়। এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক। তাই প্রচুর পরিমাণে তরল গ্রহণ করুন:

    • ডাবের জল (প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোলাইটসের জন্য)।

    • খাবার স্যালাইন (ORS)।

    • ফলের রস (যেমন: কমলা, পেঁপে, লেবু)।

    • লেবুর শরবত বা সাধারণ বিশুদ্ধ জল।

    • মুরগির বা সবজির স্যুপ।

৩. জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণ (সঠিক ওষুধ)

জ্বর ও তীব্র শারীরিক ব্যথা ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণ। ওষুধ গ্রহণের ক্ষেত্রে এই সময় চরম সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

করণীয়বর্জনীয় (অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ)

প্যারাসিটামল: শুধুমাত্র প্যারাসিটামল (Paracetamol) বা অ্যাসিটামিনোফেন (Acetaminophen) সেবন করুন। জ্বরের মাত্রা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক ডোজে ওষুধ খান।

অ্যাসপিরিন/এনএসএআইডি: অ্যাসপিরিন (Aspirin), আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen), ডাইক্লোফেনাক (Diclofenac) বা ক্লোফেনাক-জাতীয় Non-Steroidal Anti-Inflammatory Drugs (NSAIDs) একদমই খাবেন না। এই ধরনের ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়।

ঠান্ডা জল দিয়ে গা মোছানো: জ্বর ১০২°F-এর বেশি হলে প্যারাসিটামল খাওয়ার পাশাপাশি ঠান্ডা জল দিয়ে বারবার গা মুছে দিন।

প্লেটলেট কমে যাওয়ার ভয়ে নিজে থেকে কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

৪. বিপজ্জনক লক্ষণসমূহ (ওয়ার্নিং সাইনস)

ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পরের ৪৮ ঘণ্টা (সাধারণত রোগের ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে) অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই সময়টিকে 'ক্রিটিক্যাল ফেজ' বলা হয়। নিম্নলিখিত বিপদ-চিহ্নগুলির মধ্যে যেকোনো একটি দেখা দিলে অবিলম্বে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে:

  • তীব্র পেটে ব্যথা: ক্রমাগত বা অসহ্য পেটে ব্যথা।

  • ঘন ঘন বমি: দিনে তিনবারের বেশি বমি বা বমির সঙ্গে রক্তপাত।

  • অস্বাভাবিক রক্তপাত: নাক বা মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ, মলের সাথে রক্ত যাওয়া (কালো মল), বা ত্বকের নিচে লাল ছোপ ছোপ দাগ।

  • তীব্র ক্লান্তি ও অস্থিরতা: হঠাৎ অতিরিক্ত দুর্বলতা, ঘুম ঘুম ভাব, কিংবা অস্বাভাবিক অস্থিরতা ও খিটখিটে মেজাজ।

  • শ্বাসকষ্ট: দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।

  • প্রস্রাব কমে যাওয়া: ৪-৬ ঘণ্টার মধ্যে একবারও প্রস্রাব না হওয়া।

  • ঠান্ডা হাত-পা: হাত-পা অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে যাওয়া (শকের লক্ষণ)।

৫. মশা থেকে সুরক্ষা

ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই মশারির নিচে রাখতে হবে, এমনকি দিনের বেলায়ও। কারণ এই রোগীকে কামড়ানো মশাটি পরবর্তীতে অন্য সুস্থ মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে।

  • মশা তাড়ানোর স্প্রে বা লোশন ব্যবহার করুন।

  • ঘরের দরজা-জানালায় মশার জাল লাগান।

ডেঙ্গু হলে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন এবং পর্যাপ্ত যত্ন নিন। সচেতনতা এবং সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব।

Post a Comment

0 Comments