শিশুদের নিউমোনিয়া: লক্ষণ, করণীয় ও সতর্কতা
নিউমোনিয়া হলো ফুসফুসের একটি গুরুতর সংক্রমণ, যা শ্বাসতন্ত্রের নিচের অংশে প্রদাহ সৃষ্টি করে। শিশুদের মধ্যে এটি প্রধানত ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার কারণে ঘটে এবং সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি মারাত্মক হতে পারে।
এই নির্দেশিকাটি শুধুমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য। নিউমোনিয়ার সন্দেহ হলে, অবিলম্বে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য।
১. নিউমোনিয়ার প্রধান লক্ষণগুলো কী?
নিউমোনিয়ার লক্ষণগুলি প্রায়শই সাধারণ সর্দি-কাশির মতো শুরু হয়, তবে পরে তা খারাপ দিকে মোড় নেয়। এই লক্ষণগুলি দেখলে সতর্ক হতে হবে:
ক. শ্বাস-প্রশ্বাসে পরিবর্তন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)
এটি নিউমোনিয়া শনাক্ত করার প্রধান উপায়।
দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস (Fast Breathing): শিশু স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে। বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি শ্বাস নেওয়াই প্রধান নির্দেশক।
শ্বাসকষ্টে বুক ডেবে যাওয়া (Chest Indrawing): এটি নিউমোনিয়ার সবচেয়ে গুরুতর লক্ষণ। যখন শিশু শ্বাস নেয়, তখন তার বুকের নিচের অংশ (পাঁজরের ঠিক নিচে) ভিতরের দিকে দেবে যায় বা খাঁচার মতো দেখায়।
আওয়াজ সহ শ্বাস (Wheezing or Grunting): শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো বা ঘড়ঘড় শব্দ হওয়া।
অসহনীয় কাশি: শুকনো বা কফযুক্ত কাশি যা সহজে থামতে চায় না।
খ. সাধারণ লক্ষণসমূহ
উচ্চ জ্বর: হঠাৎ তীব্র জ্বর আসা যা সহজে কমতে চায় না।
খাবার গ্রহণে অনীহা: শিশু স্তন্যপান বা খাবার খেতে চাইবে না।
বমি বা ডায়রিয়া: অনেক ক্ষেত্রে পেটের সমস্যাও দেখা যেতে পারে।
ক্লান্তি ও দুর্বলতা: শিশু অস্বাভাবিকভাবে নিস্তেজ বা ঘুমন্ত থাকবে।
২. প্রাথমিক করণীয় (চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে)
যদি আপনার সন্তানের মধ্যে নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা যায়, তবে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এই সময়ের মধ্যে আপনি নিম্নোক্ত ব্যবস্থাগুলো নিতে পারেন:
শান্ত রাখুন ও পর্যবেক্ষণ করুন: শিশুকে শান্ত রাখুন এবং তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিকভাবে চলছে কিনা তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। কান্না বা দৌড়াদৌড়ি করলে শ্বাসকষ্ট আরও বাড়তে পারে।
পর্যাপ্ত তরল দিন: পানিশূন্যতা রোধ করার জন্য শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ, খাবার স্যালাইন (ORS) বা পরিষ্কার জল পান করান। তরল খাবার কফ পাতলা করতেও সাহায্য করে।
নাক পরিষ্কার রাখুন: যদি শিশুর নাক বন্ধ থাকে, তবে স্যালিন ড্রপস ব্যবহার করে বা একটি সাকশন বাল্ব ব্যবহার করে নাক পরিষ্কার করে দিন, যাতে শ্বাস নিতে সুবিধা হয়।
জ্বর নিয়ন্ত্রণ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল দিয়ে জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখুন। মনে রাখবেন, প্যারাসিটামল নিউমোনিয়ার চিকিৎসা নয়, এটি শুধুমাত্র সাময়িক আরাম দেয়।
ধূমপানমুক্ত পরিবেশ: নিশ্চিত করুন যে শিশু ধূমপান বা দূষিত ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশে আছে।
৩. কখন দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবেন (জরুরি সতর্কতা)
নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি জীবনের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এইগুলি দেখলে এক মুহূর্তও দেরি না করে শিশুকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান:
ঠোঁট বা নখ নীল হওয়া (Cyanosis): এটি ইঙ্গিত দেয় যে শিশু পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাচ্ছে না।
শ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট: বুকের খাঁচা খুব বেশি ডেবে যাওয়া বা শিশু শ্বাস নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত জোর দিচ্ছে।
অত্যধিক নিস্তেজতা: শিশু কোনোভাবেই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না, ঘুম থেকে জাগানো কঠিন হচ্ছে বা অস্বাভাবিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
খাবার প্রত্যাখ্যান: শিশু এক ফোঁটা তরলও মুখে নিতে পারছে না।
তীব্র ব্যথা: বুকে বা পেটে অসহনীয় ব্যথা হচ্ছে।
৪. চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
চিকিৎসা
নিউমোনিয়ার চিকিৎসা এর কারণের উপর নির্ভর করে। যদি এটি ব্যাকটেরিয়াজনিত হয়, তবে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন। যদি ভাইরাসজনিত হয়, তবে সাধারণত অ্যান্টিভাইরাল নয়, বরং সহায়ক চিকিৎসাই দেওয়া হয় (যেমন অক্সিজেন বা নেবুলাইজেশন)।
গুরুত্বপূর্ণ: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শিশুকে কখনো নিজে অ্যান্টিবায়োটিক বা কাশির সিরাপ দেবেন না।
প্রতিরোধ
নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করাই সবচেয়ে ভালো। কিছু পদক্ষেপ যা আপনি নিতে পারেন:
টিকা (Vaccination): নিউমোনিয়া (PCV) এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা (Flu) এর টিকাগুলি নিউমোনিয়া প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়স অনুযায়ী আপনার শিশুকে সবকটি টিকা দিন।
হাত ধোয়া: নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করান (খাওয়ার আগে ও পরে, টয়লেট ব্যবহারের পর)।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: অপরিষ্কার পরিবেশ এবং রোগাক্রান্ত মানুষের কাছ থেকে শিশুকে দূরে রাখুন।
পুষ্টি: শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার দিন এবং ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ান।

0 Comments