বাংলাদেশের সংবিধান এবং ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১’ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে বা পদ শূন্য হলে পরবর্তী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের একটি সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।
বিএনপি বা ১১ দলীয় জোটের মতো রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো কীভাবে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মনোনয়ন দেবে এবং সংসদ কীভাবে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে, তা নিচে ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. সময়সীমা ও মধ্যবর্তী ব্যবস্থা
- শূন্য পদের সময়সীমা: সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট সম্পন্ন করতে হয়।
- ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি: নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
২. যোগ্যতা
সংবিধানের ৪৮(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রার্থীকে নিম্নলিখিত যোগ্যতাগুলো পূরণ করতে হবে:
- বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে।
- বয়স ন্যূনতম ৩৫ বছর হতে হবে।
- সংসদ সদস্য (MP) হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে।
- পূর্বে অভিশংসনের (Impeachment) মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হননি—এমন ব্যক্তি হতে হবে।
৩. বিএনপি ও জোটের মনোনয়ন জমা দেয়ার আইনি প্রক্রিয়া
রাজনৈতিক দল (যেমন: বিএনপি) বা একাধিক দলের নির্বাচনী জোট (যেমন: ১১ দলীয় জোট) সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিলেও, সংবিধিবদ্ধ নিয়মে মনোনয়নপত্রটি সংসদের মাধ্যমেই পেশ করতে হয়:
- প্রস্তাবক ও সমর্থক: প্রতিটি প্রার্থীর জন্য সংসদে একজন সংসদ সদস্যকে ‘প্রস্তাবক’ (Proposer) এবং অন্য একজন সংসদ সদস্যকে ‘সমর্থক’ (Seconder) হিসেবে স্বাক্ষর করতে হয়।
- মনোনয়ন জমা:
- বিএনপির ক্ষেত্রে:
বিএনপি তার সংসদীয় দলের (Parliamentary Party) বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে একজন প্রার্থী চূড়ান্ত করবে। তাদের দলের একজন সংসদ সদস্য প্রস্তাবক এবং আরেকজন সমর্থক হিসেবে প্রার্থীর সম্মতিক্রমে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেবেন। - ১১ দলীয় জোটের ক্ষেত্রে:
জোটভুক্ত দলগুলোর সংসদ সদস্যরা বৈঠক করে সর্বসম্মত প্রার্থীর নাম নির্ধারণ করবেন। অতঃপর জোটের মধ্য থেকে অন্তত দুজন সংসদ সদস্য ওই প্রার্থীর প্রস্তাবক ও সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর করে ফরম জমা দেবেন।
- একাধিক মনোনয়ন:
একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ তিনটি মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন।
৪. মনোনয়নপত্র বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহার
- বাছাইকরণ (Scrutiny):
প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্ধারিত দিনে সকল প্রার্থী, প্রস্তাবক ও সমর্থকদের উপস্থিতিতে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করবেন। - একক প্রার্থী হলে: যদি বাছাই শেষে কেবল একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ থাকে (অথবা বাকিরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন), তবে নির্বাচন কমিশন তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করবে।
- একাধিক প্রার্থী থাকলে: যদি বিএনপি এবং ১১ দলীয় জোট উভয়েরই বৈধ প্রার্থী থাকে, তবে নির্বাচন কমিশন সংসদ ভবনে নির্ধারিত তারিখে ভোটগ্রহণের আয়োজন করবে।
৫. জাতীয় সংসদে ভোটগ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণা
- ভোটাধিকার:
রাষ্ট্রপতির পদে কোনো সাধারণ জনগণ সরাসরি ভোট দেন না; জাতীয় সংসদের সদস্যরা (MP) পরোক্ষভাবে ভোট প্রদান করেন। - ভোটের পদ্ধতি: নির্ধারিত দিনে সংসদ কক্ষে গোপন ব্যালটের (Secret Ballot) মাধ্যমে ভোটগ্রহণ পরিচালিত হয়।
- বিজয় নির্ধারণ: যে প্রার্থী সংসদে উপস্থিত সংসদ সদস্যদের প্রদত্ত বৈধ ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবেন, তিনি নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হবেন।
৬. শপথ গ্রহণ
নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশের পর, নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি স্পিকারের (বা স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকারের) উপস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণের শপথ পাঠ করবেন এবং কার্যভার গ্রহণ করবেন।


0 মন্তব্যসমূহ